The Dynamic Pulse of Digital Bangladesh

Adventure

পর্দার পেছনের ‘বেয়ার গ্রিলস’: ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড-এর অজানা অধ্যায়

টিভি শো-র ইতিহাসে এক কালচারাল ফেনোমেননের নাম ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ (Man vs. Wild)। সাধারণত যেকোনো রিয়েলিটি শো-র জনপ্রিয়তা একটা সময়ে গিয়ে থমকে যায়, দর্শক আগ্রহ হারায়। কিন্তু এই চেনা তত্ত্বকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দীর্ঘ পাঁচ বছর রূপালী পর্দায় রাজত্ব করেছেন বেয়ার গ্রিলস। কখনো সাপ, ব্যাঙ বা জ্যান্ত পোকা-মাকড় খেয়ে, আবার কখনো মরুভূমির চোরাবালি কিংবা উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দেখিয়েছেন চরম প্রতিকূলতায় টিকে থাকার লড়াই। ডিসকভারি চ্যানেলের তুমুল জনপ্রিয় এই শো-র পর্দার পেছনের এমন কিছু রোমাঞ্চকর ও অজানা দিক নিয়ে আজকের এই বিশেষ আয়োজন।

. ‘এডওয়ার্ডযেভাবে হলেনবেয়ার

শো-র প্রাণকেন্দ্র বেয়ার গ্রিলসের আসল নাম এডওয়ার্ড মাইকেল গ্রিলস। ১৯৭৪ সালের ৭ জুন আয়ারল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এই তারকার পরিবারে খেলাধুলার দারুণ ঐতিহ্য ছিল; তার মাতামহ ও প্রমাতামহ দুজনেই ছিলেন পেশাদার ক্রিকেটার। তবে এডওয়ার্ডের অ্যাডভেঞ্চারের হাতেখড়ি তার পিতা মাইকেল গ্রিলসের মাধ্যমে, যিনি ছিলেন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর রয়্যাল ইয়ার্ডস স্কোয়াড্রন সেইলর। ছোটবেলাতেই বাবার হাত ধরে স্কাই ডাইভিং শেখেন এডওয়ার্ড। কিন্তু ‘বেয়ার’ নামটির পেছনে রয়েছে এক মিষ্টি গল্প। তার জন্মের মাত্র সপ্তাহ-খানেক পর তার বড় বোন লারা ফসেট ভালোবেসে তাকে ‘বেয়ার’ নামে ডাকতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে তার স্থায়ী পরিচয় হয়ে যায়।

. মেরুদণ্ড ভাঙা প্যারাট্রুপার থেকে এভারেস্ট জয়ী

বেয়ার গ্রিলসের সামরিক ক্যারিয়ার ও সাহসিকতার গল্প যেকোনো সিনেমাকেও হার মানায়। তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল এয়ার সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত ‘21 SAS Regiment’-এর একজন প্যারাট্রুপার ছিলেন। জাম্বিয়ায় এক প্যারাসুট ট্রেনিংয়ের সময় উঁচুতলা থেকে পড়ে গিয়ে তার মেরুদণ্ডের তিনটি হাড় ভেঙে যায়। চিকিৎসকেরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি আর কোনোদিন স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবেন না। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র তিনি ছিলেন না। মাত্র দেড় বছরের মাথায় তীব্র মানসিক শক্তিতে সুস্থ হয়ে উঠে তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমে আসেন এভারেস্ট জয়ের প্রস্তুতি নিতে। ১৯৯৮ সালের ১৬ মে, মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি জয় করেন দুর্গম এভারেস্ট। পরবর্তীতে তার এই অসামান্য অবদানের জন্য ব্রিটিশ সেনাবাহিনী তাকে বিভিন্ন সম্মানসূচক পদে ভূষিত করে, যার ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে তিনি ‘কর্নেল’ উপাধি লাভ করেন।

. দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দ্বিতীয় পর্ব

২০০৬ সালের ৬ মার্চ ডিসকভারি চ্যানেল ‘দ্য রকিজ’ নামে এই শো-র পাইলট এপিসোড সম্প্রচার করে। কিন্তু প্রথম পর্বের পর দ্বিতীয় পর্বটি পর্দায় আসতে সময় লেগেছিল দীর্ঘ ৮ মাস! এরপর অবশ্য শো-টিকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত ৭টি সিজনে মোট ৭৩টি শ্বাসরুদ্ধকর এপিসোড উপহার দিয়েছে এই সিরিজ।

. ক্যামেরার পেছনেরপরিকল্পিতসারভাইভাল

টেলিভিশনে দেখানো হয় বেয়ার গ্রিলসকে সম্পূর্ণ অপরিচিত ও দুর্গম এক স্থানে একা ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। প্রতিটি এপিসোড নির্মাণ করতে পুরো টিমের ১০-১২ দিন সময় লাগত। সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হতো নিরাপদ অথচ রোমাঞ্চকর লোকেশন খোঁজার পেছনে। জায়গা চূড়ান্ত করার পর কঠোর নিরাপত্তা বিধি মেনে সেখানে কিছু দৃশ্য কৃত্রিমভাবে সাজানো হতো। আর পর্দার আড়ালে গাইড হিসেবে কাজ করতেন একঝাঁক ‘সারভাইভাল এক্সপার্ট’।

. এক শো, ভিন্ন নাম

ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে এই শো-র নামও বদলে যেত। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ অধিকাংশ দেশে এটি ‘Man vs. Wild’ নামে পরিচিত হলেও, এর মূল দেশ যুক্তরাজ্যে (UK) শো-টি সম্প্রচারিত হতো ‘Born Survivor’ নামে। আবার কিছু দেশে একে ‘Ultimate Survival’ নামেও প্রচার করা হতো।

. বেয়ারের জীবনের সবচেয়ে জঘন্য খাবার!

পর্দায় বেয়ার গ্রিলসকে বিচ্ছু, পচা মাংস, ভালুকের মল কিংবা নিজের মূত্র পর্যন্ত পান করতে দেখা গেছে। কিন্তু তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জঘন্য স্বাদের খাবার কোনটি ছিল? বেয়ারের নিজের ভাষ্যমতে, সেটি ছিল জ্যান্ত ‘ছাগলের অণ্ডকোষ’। এই খাবারটি মুখে দিয়ে স্বয়ং বেয়ার গ্রিলসও বমি করে ফেলেছিলেন। অথচ আরব মরুভূমির বহু যাযাবর জাতি এই খাবারটি বেশ তৃপ্তি সহকারেই খেয়ে থাকে।

. আকাশের নিচে যার ভয়

যিনি বাঘ-সিংহের ডেরায় অনায়াসে ঘুরে বেড়ান, সেই বেয়ার গ্রিলসেরও একটি গোপন ভয় আছে। তিনি প্রচণ্ড ‘উচ্চতা ভীতি’ বা অ্যাক্রোফোবিয়ায় (Acrophobia) ভোগেন। যদিও পেশাগত কারণে বহুবার তাকে আকাশ থেকে লাফিয়ে পড়তে বা উঁচু পাহাড়ে চড়তে দেখা গেছে, তবে প্রতিবারই তাকে নিজের ভেতরের এই আদিম ভয়ের সাথে লড়াই করতে হয়।

. স্ক্রিপ্টেড বিতর্ক হোটেলের রাত

অভিযানে বেয়ার কি সত্যি প্রতি মুহূর্তে জীবন ঝুঁকিতে ফেলতেন? শো-র কিছু বিহাইন্ড দ্য সিন ফাঁস হওয়ার পর জানা যায়, বেয়ারের সাথে শুধু একজন ক্যামেরাম্যান থাকতেন না, বরং পুরো একটা প্রোডাকশন ক্রু ও মেডিকেল টিম সাথে চলত। এমনকি শুটিং স্পটের কাছাকাছি কোনো বিলাসবহুল হোটেলে বেয়ারের রাত কাটানোর খবরও চাউর হয়। আগ্নেয়গিরির এক পর্বে কৃত্রিম ধোঁয়া ব্যবহার এবং অন্য এক পর্বে ভালুকের নকল কস্টিউম পরা মানুষ ব্যবহারের তথ্য সামনে এলে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

. ‘ডিসক্লেমারএবং সত্যের মুখোমুখি

নকল দৃশ্য ও কৃত্রিমতার বিতর্কে যখন শো-র জনপ্রিয়তায় ধাক্কা লাগে, তখন ডিসকভারি চ্যানেল বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ নেয়। তারা চতুর্থ সিজন থেকে অনুষ্ঠানের শুরুতে একটি স্পষ্ট ‘Disclamer’ বা সতর্কবার্তা যুক্ত করে দেয়। সেখানে পরিষ্কার বলা হয়—এটি কোনো লাইভ ডকুমেন্টারি নয়, বরং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল শেখানোর একটি নির্দেশনামূলক শো, যেখানে বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ক্রুদের পরিচয় করিয়ে দিতে বেশ কিছু বিহাইন্ড-দ্য-সিন পর্বও আপলোড করা হয়।

১০. ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদানের গুজব

২০১৫ সালে ‘হিন্দুস্তান টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদনকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রটে যায় যে, বেয়ার গ্রিলস নাকি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চান। আসল ঘটনা হলো, বেয়ার তার অতীতে দার্জিলিং ভ্রমণের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে ভারতীয় সেনাদের আতিথেয়তার প্রশংসা করেছিলেন মাত্র। তাছাড়া আইনি নিয়ম অনুযায়ী ভারত, নেপাল ও তিব্বতের নাগরিক ছাড়া অন্য দেশের কারও ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার সুযোগ নেই।

১১. সভ্যতার আলোহীন নিজস্ব দ্বীপ

অ্যাডভেঞ্চার যার রক্তে, তার অবসর যাপনের জায়গাও তো ভিন্ন হবেই! ২০০১ সালে প্রায় ৯৫ হাজার ইউরো খরচ করে ওয়েলসের উপকূলে ‘সেন্ট টুডওয়াল’স ওয়েস্ট’ নামক একটি নির্জন দ্বীপের ২০ একর জমি কিনে নেন বেয়ার। মূল ভূখণ্ড থেকে ৫ মাইল দূরের এই দ্বীপে কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই, আছে শুধু একটি বাতিঘর আর ছোট্ট একটি ঘর। স্পিডবোট নিয়ে মাঝে মাঝেই স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে এই আদিম প্রকৃতির মাঝে একান্তে সময় কাটাতে চলে যান তিনি।

১২. ডিসকভারি পরবর্তী নতুন দিগন্ত

২০১২ সালে ডিসকভারির সাথে চুক্তি শেষ হলেও বেয়ারের যাত্রা থামেনি। এরপর তিনি ডিসকভারির সাথেই ‘Worst Case Scenario’, ‘Escape from Hell’, এবং ‘Running Wild with Bear Grylls’ এর মতো হিট শো উপহার দেন—যেখানে বারাক ওবামা থেকে শুরু করে নরেন্দ্র মোদির মতো বিশ্বনেতারাও অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছেন। ২০১৯ সালে তিনি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ‘You vs. Wild’ নামের একটি ইন্টারঅ্যাক্টিভ শো শুরু করেন, যা বিশ্বজুড়ে দারুণ সাড়া ফেলে।

টিভি পর্দার ‘ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড’ হয়তো কিছুটা পরিকল্পিত, কিন্তু প্রতিকূল প্রকৃতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বেয়ার গ্রিলস যে অদম্য সাহস আর টিকে থাকার অনুপ্রেরণা বিশ্ববাসীকে জুগিয়েছেন, তা টেলিভিশন ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *