আজ বাবা দিবস

ফিচার ডেস্ক: আজ বিশ্ব বাবা দিবস। প্রতি বছর এই দিনটি এলে চারদিকে বাবাদের নিয়ে কতশত আলোচনা হয়। কিন্তু বাবাদের জীবনের গল্পটা মায়েদের মতো খুব একটা গুছিয়ে বা ঘটা করে কখনোই বলা হয়ে ওঠে না। অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজের একটি হলো— একজন দায়িত্ববান বাবা হওয়া। রিকশাচালক, দিনমজুর থেকে শুরু করে করপোরেট জগতের ধনী বাবা— সবার জীবনেই একটা গল্প এক সুতোয় বাঁধা; তা হলো নিজের সবকিছু উজাড় করে শুধু পরিবারের জন্য উপার্জন করা। এমনকি একজন চোরও যখন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে মার খায়, সেও চিৎকার করে বলে— ‘আমার ঘরে একটা বাচ্চা আছে, তার খাবারের কিছু নাই।’ সন্তানের জন্য কতটা ঝুঁকি একজন বাবা নিতে পারেন, তা হয়তো এই এক লাইনেই স্পষ্ট হয়ে যায়।
সুপারহিরোর বদলে যাওয়া রূপ
ছোটবেলায় আমাদের সবার কাছে ‘বাবা’ মানেই ছিল এক অতিমানব বা সুপারহিরো। যার কাঁধে চড়লে পুরো পৃথিবীটা দেখা যেত, যেকোনো বিপদে যিনি ছিলেন আমাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। তখন আমরা বুঝিনি, সেই চড়তে দেওয়া কাঁধটা আসলে কতটা ভারী দায়িত্ব বহন করছিল। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের সেই প্রাণোচ্ছল সুপারহিরো বাবা কেমন যেন বদলে যেতে থাকেন। তিনি ধীরে ধীরে একটু চাপা স্বভাবের হয়ে ওঠেন। সংসারের অভাব, কর্মক্ষেত্রের সংগ্রাম কিংবা নিজের ভেঙে পড়া শরীর— কোনো কিছু নিয়েই বাবাদের মুখ থেকে কখনো অভিযোগের একটা শব্দও বের হয় না।
বয়সের শেষভাগে এসে অনেক বাবাই একটু খিটখিটে হয়ে ওঠেন, যা অনেক সময়ই সন্তানেরা সহজে মেনে নিতে পারে না। কিন্তু আমরা ভুলে যাই, জীবনের দীর্ঘ লড়াই শেষে বয়সকালে এসে তাঁদের ক্লান্ত মগজ আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারে না; ঠিক যেমনটা ছোটবেলায় অবুঝ থাকার কারণে আমরা করতাম।
‘আমার লাগবে না, তুই নে’— বাবাদের চিরচেনা কৌশল
বাবারা নিজেদের শখ বা চাহিদা বদলে ফেলার এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করেন। সন্তানদের ভালো রাখতে তাঁরা অনায়াসেই বলতে পারেন— ‘তুই নে এটা, আমার লাগবে না, আমার তো আছে’ কিংবা ‘তুই খা, এটা আমার পেটে সইবে না।’
একটা সময় বাবাদের মনে এক নীরব ভয় ঢুকে যায়— ‘আমি চলে গেলে আমার সন্তানের কী হবে?’ তাই মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁরা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত থাকেন। তাঁরা শুধু পারেন না রাতারাতি আমাদের এতটা বড় করে দিতে, যাতে আমরা সব প্রতিকূল পরিস্থিতির ভার একাই বইতে পারি।
বুকের বাম পাশে চেপে রাখা নীরব ত্যাগ
বাবার ভালোবাসাটা আসলে মায়ের মতো চড়া সুরে প্রকাশ পায় না, সেটা থাকে খুব নিভৃতে। নিজের মনের ভেতরের সব কষ্ট, ক্লান্তি আর না-বলা দুঃখগুলো তিনি সযত্নে চেপে রাখেন বুকের বাম পাশে, যাতে সন্তানের কপালে চিন্তার কোনো ভাঁজ না পড়ে। সন্তানের সামান্য সাফল্যে যিনি আড়ালে গিয়ে চোখের কোণের আনন্দের অশ্রু মোছেন, তিনিই তো বাবা।
আজ সমাজে আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদানটি এই মানুষটারই। তিনি নিজের মেরুদণ্ড ক্ষয় করে আমাদের সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছেন। পৃথিবীর সব বাবা ভালো থাকুক। তাঁদের এই নীরব ত্যাগ ও সমঝোতা যেন আমরা সন্তানেরা অন্তত অনুভূতির গভীরতা দিয়ে অনুধাবন করতে পারি— বাবা দিবসে এটাই হোক আমাদের একমাত্র অঙ্গীকার।
