ধেয়ে আসছে ‘এলনিনো’: হুমকিতে কোটি মানুষের জীবন

বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর চরম বিপর্যয় ‘এল নিনো’: তপ্ত হচ্ছে পৃথিবী, হুমকিতে কোটি মানুষের জীবন
বিশেষ প্রতিবেদক, ঢাকা:
বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার অস্বাভাবিক ও খামখেয়ালি আচরণের পেছনে বিজ্ঞানীরা এখন একটি বিশেষ প্রাকৃতিক চক্রকে সবচেয়ে বেশি দায়ী করছেন, যার নাম ‘এল নিনো’ (El Niño)। স্প্যানিশ এই শব্দের অর্থ ‘ছোট ছেলে’ বা ‘যিশুখ্রিস্টের শিশু রূপ’। প্রশান্ত মহাসাগরের পেরু উপকূলের জেলেরা লক্ষ্য করেছিলেন, বড়দিনের আশেপাশে সমুদ্রের পানি হঠাৎ অস্বাভাবিক গরম হয়ে ওঠে, সেখান থেকেই এই নামকরণ। তবে নামের মধ্যে একধরনের কোমলতা থাকলেও, বিশ্ব আবহাওয়ায় এর প্রভাব অত্যন্ত বৈরী, চরম এবং ধ্বংসাত্মক।
এল নিনো কী এবং এটি কীভাবে সৃষ্টি হয়?
সহজ কথায়, এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সমুদ্রের উপরিভাগের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে বৃদ্ধি পাওয়া। এটি কোনো আকস্মিক ঝড় বা সাইক্লোন নয়, বরং জলবায়ুর একটি সাময়িক ও পর্যায়বৃত্তিক পরিবর্তন (Climate Pattern), যা সাধারণত ২ থেকে ৭ বছর পর পর দেখা দেয় এবং ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
সৃষ্টির প্রক্রিয়া:
স্বাভাবিক সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের শক্তিশালী পূবালী বাতাস (Trade Winds) বা বাণিজ্য বায়ু ক্রান্তীয় অঞ্চলের গরম পানিকে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। এর ফলে দক্ষিণ আমেরিকার পেরু বা ইকুয়েডর উপকূলে সমুদ্রের নিচের ঠাণ্ডা ও পুষ্টিকর পানি ওপরে উঠে আসে।
কিন্তু এল নিনো যখন সক্রিয় হয়, তখন এই পূবালী বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে। কোনো কোনো সময় এই বাতাস দিক পরিবর্তন করে উল্টো দিকে (পশ্চিম থেকে পূর্বে) বইতে শুরু করে। ফলে অস্ট্রেলিয়ার দিকে জমে থাকা গরম পানির বিশাল স্রোত দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের দিকে ফিরে আসে। সমুদ্রের উপরিভাগের এই অস্বাভাবিক উষ্ণতা বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক চক্রকে ওলটপালট করে দেয় এবং বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।
এর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে কি ক্ষতি হয়?
এল নিনোর প্রভাবে মূলত দুই ধরনের চরম আবহাওয়া দেখা যায়—ভয়াবহ খরা এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বা বন্যা। এর ফলে বিশ্বব্যাপী নিম্নোক্ত ক্ষতিগুলো হয়ে থাকে:
- ভয়াবহ খরা ও দাবানল: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় বৃষ্টিপাত আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে নদী-নালা শুকিয়ে যায়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যায় এবং বনাঞ্চলে তীব্র দাবানল সৃষ্টি হয়।
- বন্যা ও ভূমিধস: যেখানে সাধারণত কম বৃষ্টি হয় (যেমন দক্ষিণ আমেরিকার শুষ্ক উপকূল), সেখানে এল নিনোর কারণে মুষলধারে বৃষ্টি এবং আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়, যা পাহাড়ি অঞ্চলে মারাত্মক ভূমিধস ঘটায়।
- কৃষি ও খাদ্য সংকট: খরা এবং বন্যার সরাসরি প্রভাব পড়ে কৃষিখাতে। চাল, গম, ভুট্টা ও কফির মতো প্রধান ফসলের উৎপাদন ব্যাহত করায় বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম বেড়ে যায় এবং লাখ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
- সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি: সমুদ্রের পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের কোরাল বা প্রবাল প্রাচীর মারা যায় (Coral Bleaching)। এছাড়া পেরু উপকূলে ঠাণ্ডা পানির প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় মাছের প্রধান খাদ্য ‘প্লাঙ্কটন’ ধ্বংস হয়ে যায়, যার ফলে কোটি কোটি মাছ মারা যায় এবং মৎস্য শিল্প ধসে পড়ে।
পৃথিবীর কোন অঞ্চলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে?
এল নিনো একটি বৈশ্বিক ঘটনা হলেও পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে এর তাণ্ডব সবচেয়ে তীব্র ও প্রত্যক্ষ হয়:
| আক্রান্ত অঞ্চল | প্রধান প্রভাব ও ক্ষয়ক্ষতি |
| দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া | ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র খরা দেখা দেয়। দাবানলের প্রকোপ বাড়ে এবং পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়। |
| দক্ষিণ আমেরিকা (পশ্চিম উপকূল) | পেরু, ইকুয়েডর ও চিলিতে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত, বন্যা ও ভূমিধস হয়। এখানকার মৎস্য খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। |
| আফ্রিকা মহাদেশ | দক্ষিণ আফ্রিকায় খরা ও ফসলহানি ঘটে, অন্যদিকে পূর্ব আফ্রিকায় (যেমন কেনিয়া বা সোমালিয়া) অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। |
| দক্ষিণ এশিয়া (বাংলাদেশ ও ভারত) | এই অঞ্চলে এল নিনোর প্রভাবে সাধারণত বর্ষা বা মনসুন বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হয় এবং গ্রীষ্মকালে তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ (Heatwave) তৈরি হয়। নদীগুলোর পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে। |
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা:
পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে এল নিনোর তীব্রতা এবং পুনরাবৃত্তির হার দিন দিন আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এটি শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক বড় হুমকি। এর ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে বিশ্বব্যাপী দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি ও জলবায়ু অভিযোজন (Climate Adaptation) ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।
